বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দেশ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা নয়; এটি প্রায় ৩৬ বছর ধরে চলা নারী নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার অবসান ঘটাতে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশ পেতে যাচ্ছে একজন নতুন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী।
১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে শুরু হয় নারী প্রধানমন্ত্রী অধ্যায়। এরপর শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার পালাক্রমে ক্ষমতায় আসা—এই দুই নেত্রীকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে দেশের রাজনীতি। তিন দশকের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তাঁরা।
শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে প্রথমবার এবং পরে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত টানা চার মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে, খালেদা জিয়া তিনবার প্রধানমন্ত্রী হন এবং বিরোধী রাজনীতির প্রধান মুখ হিসেবে দীর্ঘ সময় নেতৃত্ব দেন।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজনীতিতে নাটকীয় মোড় নেয়। আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। পরে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় দলটি আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
এদিকে গত ৩০ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়ার মৃত্যু দুই নেত্রীর যুগের চূড়ান্ত অবসান ঘটায়। বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বে আছেন তারেক রহমান, যিনি নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি জয়ী হলে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটও নির্বাচনী লড়াইয়ে সক্রিয়। তাদের সম্ভাব্য সরকারপ্রধানও একজন পুরুষ নেতা। ফলে জাতীয় নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় প্রায় ৩৬ বছর পর পুরুষ নেতৃত্বে ফিরছে বাংলাদেশ।
স্বাধীনতার পর ১৯৮৯-১৯৯০ সালে কাজী জাফর আহমদ ছিলেন সর্বশেষ পুরুষ প্রধানমন্ত্রী। এরপর দীর্ঘ সময় নারী নেতৃত্বের হাতেই ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন কেবল ব্যক্তির নয়—এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ক্ষমতার ভারসাম্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান বলেন, “নতুন নেতৃত্বের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন ও আস্থা ফিরিয়ে আনা।”
গত এক দশকের বিতর্কিত নির্বাচনের পর ত্রয়োদশ নির্বাচনকে ঘিরে রয়েছে ব্যাপক প্রত্যাশা। অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য ভোট হলে তা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নতুন ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ এখন অপেক্ষায়—নতুন নেতৃত্ব কি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করবে, নাকি পুরোনো দ্বন্দ্বই নতুন আঙ্গিকে ফিরে আসবে?
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!